১০৬। সূরা আল কুরইশ (কুরইশ বংশের মানুষ)
সূরার সারসংক্ষেপঃ ১ম আয়াতে বলা হয়েছে যে কুরইশদের নিরাপত্তার জন্য...এই আয়াতটি আসলে আগের সূরার সাথে সম্পর্কযুক্ত। সূরা আল ফিল এ আল্লাহ কাবা ধ্বংস করার পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দেয়ার বর্ননা দিয়েছেন এবং তার একটি কারন ছিলো কুরইশদের নিরাপত্তা। সূরা ফিলে বর্নিত ইয়েমেন এর ঐ আবরাহা ও তার বাহিনী থাকলে হয়তো তারা কুরইশদের বাঁধা দিতো। কিন্তু আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে সেই বাঁধা দূর করেছেন এবং নিরাপত্তা দান করেছেন।
২য় আয়াত এ সফরের ক্ষেত্রে ‘রিহলাহ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন আল্লাহ। এর অর্থ যে সফর/ভ্রমনে বাণিজ্য পন্য, মালপত্র বহন করা হয়। কুরইশরা শীতের ও গ্রীষ্ম উভয় সময়েই বাণিজ্য সফর করতো অত্যন্ত নিরাপত্তার সাথে। তারা যেহেতু কাবার তত্ত্বাবধায়ক ছিলো তাই কোন অন্য গোত্র বা দল তাদের নিরাপত্তায় কোন বাঁধা হয়ে দাঁড়াতো না। তাই তারা নিরাপদে ব্যবসা করতে পারতো। আল্লাহ তাদের প্রতি এই নিয়ামতের কথা স্মরন করিয়ে দেন।
এখানে ‘ইলাফ’ শব্দটি ১ম ও ২য় আয়াতে ব্যবহার হয়েছে যার অর্থ দ্রুত ভালোবাসা, কোমলতা তৈরি হওয়া। রুক্ষ পরিবেশেও আল্লাহর ঘরের পাশে থেকে তার রক্ষনাবেক্ষন করা ও ব্যবসা বাণিজ্যে সহজতার মাধ্যমে দুনিয়ায় মত্ত না হওয়ার জন্য আল্লাহ কুরইশদের অন্তরে কোমলতা ঢেলে দিয়েছিলেন। আবরাহার বাহিনীর পরাজয় সেবিষয়ে আরো ভাল ভূমিকা পালন করে।
তাদের উপর আল্লাহ যে নিয়ামত দিয়ে রেখেছেন তার প্রতিদান স্বরূপ এই ঘরের রবের ইবাদাত তাদের করা উচিত বলে আল্লাহ বলেছেন ৩য় আয়াতে। কাবা ঘরের চাবি ও কর্তৃত্ব তাদের হাতে থাকার কারনেই তারা এত সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে কিন্তু তারা কি করেছে? তারা আল্লাহর ঘর কাবার তত্ত্বাবধায়ক থাকলেও আল্লাহর পরিপূর্ন ইবাদাত করতো না। বরং শিরক এর মত জঘন্য অপরাধ করতো এবং ঐ মহান ঘরকেও তারা অপবিত্র করে রাখতো।
‘ইবাদাত’ বিষয়টা বুঝতে এর অর্থ ভালোভাবে বোঝা জরুরী। ইবাদাত আসলে ২ টি কাজের সংমিশ্রন। ১। উপাসনা ও ২। দাসত্ব । যেকোন একটি অনুপস্থিত থাকলে ইবাদাত পরিপূর্ন হয় না।দুই নামাজের মাঝের সময়ে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা হলো দাসত্ব। আনুষ্ঠানিকভাবে আল্লাহর উপাসনা করা ও উপাসনা বাদে অন্য সব সময়ে আল্লাহর দাসত্ব করাই হলো আল্লাহর ইবাদাত করা।
তৎকালীন কুরাইশরা ইবাদাত এর ২ টি ক্ষেত্রঃ ১। উপাসনা ও ২। দাসত্ব এর দুইটিই লঙ্ঘন করেছিলো। তারা এক আল্লাহর উপাসনা না করে আরো অনেক কিছুর উপাসনা করতো, আল্লাহর দাসত্ব না করে নিজের নাফস ও অন্য কিছুর দাসত্ব করতো।
পুরা সূরাটিতে আল্লাহ উত্তম পুরুষ (আমি, আমরা), মধ্যম পুরুষ (তুমি, তোমরা) না ব্যবহার করে প্রথম পুরুষ অর্থাৎ সে, তারা এভাবে বর্ননা করেছেন। অর্থাৎ দূরবর্তি পুরুষ ব্যবহার করেছেন যার দ্বারা দূরের কাউকে ইঙ্গিত করা হয়। আল্লাহ তাদের অপছন্দ করেন, রাগান্বিত বিধায় তাদের সাথে দূর সম্পর্ক রেখে বর্ননা করেছেন।
শিক্ষাঃ ১। আল্লাহ আমাদেরকে জাতিগতভাবে, ভৌগলিক অবস্থানজনিত কারনে ও অন্যান্য যেসকল নিয়ামত দিয়েছেন এবং যেসব বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন সেজন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করা। ২। শুকরিয়া স্বরূপ আমাদের উচিৎ আল্লাহর ইবাদাত করা।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের ১০৫ তম সূরা আল ফিল এর সাথে এই সূরার গভীর সম্পর্ক হয়েছে। অনেকে এই ২ টিকে একসাথে মিলিয়ে পড়েন ও একই ধারাবাহিক সূরা মনে করেন। সূরা ফিলে কুরইশদের আবরাহার ভীতি থেকে মুক্ত করে নিরাপত্তা দানের কথা বলা হয়েছে, যা সূরা আল কুরইশ এর শেষ আয়াতেও পুনরায় আল্লাহ বলেছেন। অর্থাৎ ১০৫ তম সূরা আল ফিল এ কুরইশদের শান্তি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা এবং ১০৬ তম সূরা আল কুরইশে কুরইশদের সমৃদ্ধির (অর্থনৈতিক ও খাদ্যের) কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎসূরা আল ফিল এ আবরাহার বাহিনীর আক্রমন প্রতিহত করে আল্লাহ কুরইশদের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন এবং সূরা আল কুরইশ এ চলাচল ও ব্যবসায়িক নিরাপত্তা দানের মাধ্যমে আল্লাহ কুরইশদের ক্ষুধা ও ভয় হতে নিরাপদ করেছেন।
অবাক করা ব্যাপার হলো, এই চাওয়া ছিলো কিন্তু মুসলিমদের জাতির পিতা, কাবা ঘর ও এই মক্কা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা হযরত ইবরহীমের!!! দেখুন তিনি কি দোয়া করেছিলেনঃ আর এও স্মরণ করো যে, ইবরাহীম দোয়া করেছিলঃ “হে আমার রব! এই শহরকে শান্তি ও নিরাপত্তার শহর বানিয়ে দাও। আর এর অধিবাসীদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে মানবে তাদেরকে সব রকমের ফলের আহার্য দান করো।” জবাবে তার রব বললেনঃ “আর যে মানবে না, দুনিয়ার গুটিকয় দিনের জীবনের সামগ্রী আমি তাকেও দেবো। কিন্তু সব শেষে তাকে জাহান্নামের আযাবের মধ্যে নিক্ষেপ করবো এবং সেটি নিকৃষ্টতম আবাস।” (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১২৬)
আল্লাহ তাঁর দোয়াকে কবুল করেছেন যার প্রমান সূরা ফিল ও কুরইশ। আল্লাহু আকবার। সূরা আল ফিল এর ১ম আয়াতে আল্লাহ নিজেকে মুহাম্মাদ (স) এর রব হিসাবে পরিচয় দেন। সূরা আল কুরইশ এর ৩য় আয়াতে আল্লাহ নিজেকে কাবা এর রব হিসাবে পরিচয় দেন। সূরা আন নাছর এর ১ম আয়াতে আল্লাহ মুহাম্মাদ (স) কেকাবার নিয়ন্ত্রণ দেন। অর্থাৎ সূরা আল ফিল ও আল কুরইশ এ যথাক্রমে মুহাম্মাদ (স) ও কাবার রব হিসাবে আল্লাহ নিজেকে পরিচিত করার মাধ্যমে অতি দ্রুতই তিনি তাঁর রাসূলকে তাঁর ঘরের নিয়ন্ত্রণ দিবেন মর্মে ইঙ্গিত দেন। এই ইঙ্গিত বাস্তবে রূপ নেয় সূরা আন নাছরে; আল্লাহর সাহায্যে মুহাম্মাদ এর মক্কা বিজয় ও কাবার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার মাধ্যমে।
এটা এমন হয়েছে যে, এক সূরায় আল্লাহ বীজ লাগান, আরেক সূরায় গাছ জন্মায়, আরেক সূরায় তাঁর ফুল ফোটে, ফল হয়! এখানে আল্লাহ সূরা আল ফিল এ বীজ, আল কুরইশ এ গাছ ও সূরা আন নাছর এ ফুল ও ফল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এই সূরায় আল্লাহ কুরইশদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের (খাদ্য ও নিরাপত্তা) কথা বর্ননা করেছেন এবং এর শুকরিয়া স্বরূপ তাদের কি (কাবার রবের ইবাদাত) করা উচিত তা বর্ননা করেছেন। কিন্তু আসলে তারা কি করছে তা পরের ১০৭ তম সূরা আল মাঊন (goo.gl/U1U7hn) এ উঠে এসেছে।
সূরা আল কুরইশ এ আল্লাহর প্রতি কুরইশদের অবাধ্যতা প্রকাশ পেয়েছে আল্লাহর ইবাদাত না করার মাধ্যমে। সূরা আল মাঊন এ বান্দাহর/মানুষের প্রতি কুরইশদের অবিচার প্রকাশ পেয়েছে নূন্যতম অধিকারও না দেয়ার মাধ্যমে। সুতরাং সূরা আল কুরইশ এ স্রষ্টার ও সূরা আল মাঊন এ সৃষ্টির অধিকার না দেয়ায় অর্থাৎ হাক্কুলাহ ও হাক্কুল ইবাদ পূর্ন না করায় কুরইশদের আধ্যাত্মিক ও মানবিক দৈণ্যতা প্রকাশ পেয়েছে।
তারা আসলে আল্লাহর অধিকার (হাক্কুল্লাহ) ও মানুষের অধিকার (হাক্কুল ঈবাদ) ২ টাই লঙ্ঘন করে। এই সূরায় আল্লাহর ভাষা পজিটিভ (নিয়ামতের কথা স্মরণ করানো) হলেও পরের সূরায় আল্লাহর ভাষা কিছুটা রুক্ষ হয়েছে এবং তিনি তাদের চরিত্রের নেগেটিভ দিকগুলো তুলে ধরেছেন।











মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন